মঙ্গলবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৭

পদ্মাবতী 2017 অভিনয়ে যারা : যেসব মুখ্যমন্ত্রী ও অন্যান্য সরকারি পদাধিকারী ব্যক্তিরা পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘পদ্মাবতী’ ছবির বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন, তাদের তুলোধুনো করলো ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত বলেছে, ‘যারা সরকারি পদে রয়েছেন, তাদের এ ধরণের মন্তব্য করা উচিত নয়।’
পদ্মাবতী 2017 অভিনয়ে যারা

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র, বিচারপতি ওওম খানভিলকর, ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের বেঞ্চ জানিয়েছেন, ‘এ বিষয়ে সেন্সর বোর্ডের সিদ্ধান্তই যেখানে বকেয়া রয়েছে, সেখানে সরকারি পদাধিকারীরা কীভাবে ছবির সার্টিফিকেট দেয়া বা না দেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেন? এটা সম্পূর্ণই সেন্সর বোর্ডের সিদ্ধান্ত।’

সরকারি পদাধিকারীদের এমন মন্তব্য আইনবিরুদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি এগুলো সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বলেও জানায় ভারতের এ শীর্ষ আদালত। ছবিটির পরিচালক ও প্রযোজকের বিরুদ্ধে যে ফৌজদারি মামলা করার আবেদন করা হয়েছিল তাও এদিন খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট।

অন্যদিকে, সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র না পাওয়া পর্যন্ত ছবিটি বিদেশে মুক্তি দেবেন না বলে আদালতকে আশ্বস্ত করেন সঞ্জয় লীলা বানসালির আইনজীবী। তবে সেন্সর বোর্ড ছাড়পত্র দিলেও ‘পদ্মাবতী’ রাজস্থান, গুজরাট এবং মধ্যপ্রদেশে মুক্তি পাবে না বলে আগেই জানিয়ে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীরা।

এদিকে, ‘পদ্মাবতী’ নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন টলিউডের শিল্পীরা। মঙ্গলবার বেলা ১২টা থেকে ১২.১৫ মিনিট পর্যন্ত সেখানে সমস্ত স্টুডিওর শুটিং বন্ধ রাখা হয়। ব্লাক-আউট করে দেয়া হয় ফ্লোর। কালো ব্যাজ পরে বিক্ষোভে সামিল হন শিল্পী ও কলাকুশলীরা।

সেখানে ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে অভিনেত্রী ইন্দ্রাণী হালদার বলেন, ‘শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, আমরা একটা প্যাশন নিয়ে কাজ করি। তাতে আঘাত করাটা ঠিক নয়। ভারতের অন্যতম সেরা পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালি। তাকে যেভাবে অপমানের মুখে পড়তে হয়েছে তা সত্যিই লজ্জাজনক।’

তিনি আরো বলেন, ‘ছবিটি দেখে মানুষ বিচার করুক। ‘পদ্মাবতী’র পক্ষে আমরা শিল্পীরা একসঙ্গে আছি।’ এভাবে গোটা ভারতের চলচ্চিত্র শিল্পীদের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন অন্যান্য অভিনেতা-অভিনেত্রীরা।

পদ্মাবতী 2017 অভিনয়ে বীভৎস রূপে আলাউদ্দিন খিলজী


বলিউডের আলোচিত ছবি 'পদ্মাবতী'র মূল তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন দীপিকা পাড়ুকোন, শহীদ কাপুর ও রণবীর সিং। তিন অভিনেতাকে নিয়েই দুটি করে পোস্টার ছেড়েছেন নির্মাতা সঞ্জয় লীলা বাণশালি।

রানী পদ্মাবতী ও তার স্বামীর চরিত্রে দীপিকা ও শহীদ কাপুরকে বেশ সংগ্রামী ও প্রতিবাদী রূপে দেখানো হয়েছে। বেশভূষাও ছিল স্বাভাবিকভাবে রাণী-রাজার মতোই।
ছবিতে খল চরিত্রে অভিনয় করছেন রণবীর সিং। ছবিতে আলাউদ্দিন খিলজীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। তাকে নিয়ে আজ মঙ্গলবার দুটি পোস্টার প্রকাশ করা হয়েছে। মুখে আঘাতের চিহ্ণ। চোখে-মুখেও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সহিংস ভাব। 'পদ্মাবতী' ছবিটি মুক্তি পাচ্ছে ১ অক্টোবর।

পদ্মাবতী 2017 অভিনয়ে রণবীরের চোখে কেন সুরমা?


পদ্মাবতী 2017 অভিনয়ে ছবিতে আলাউদ্দিন খিলজির চরিত্রে রণবীর সিংয়ের সঙ্গে ‘গেম অব থ্রোনস’-এর খাল দ্রোগোর মিল পাবেন ভক্তরা। সেই উন্মুক্ত বুক ও পেটা শরীর, বুনোদের মতো পোশাক, যাতে সভ্যতার কোনো ছোঁয়া লাগেনি এবং চোখ-মুখজুড়ে অপ্রতিরোধ্য ভাব। তবে সবচেয়ে বড় মিল হলো, দুজনের চোখই সুরমা দিয়ে সাজানো।  কোনো নারীরই বুঝতে ভুল হবে না— ওই চোখ কী বলছে। একজন হঠকারী আক্রমণকারী খিলজিকে চিনে নিতে ভুল হবে না কারো।

চতুর্দশ শতাব্দীর দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজিকে নিয়ে সঞ্জয় লীলা বানসালি তৈরি করেছেন পদ্মাবতী ছবিটি। খিলজির শাসনের ২০০ বছর পর মালিক মুহাম্মাদ জয়সি পদ্মাবতী নামে এক মহাকাব্য লেখেন। জনশ্রুতি আছে, চিতোরের রানী পদ্মিনীর রূপে-গুণে মুগ্ধ হয়ে তাকে জয় করতে ছুটে যান খিলজি। কিন্তু সেনাদের আগমনের খবর পেয়ে রানী ও তার অন্যান্য সখী আগুনে লাফ দেন এবং প্রাণ দিয়ে রাজপুতদের সম্মান রক্ষা করেন।

সুরমা চোখে অভিনেতারা পর্দার সামনে নতুন নয়। চোখে সুুরমা দর্শকদের স্পষ্ট বার্তাই দেয়। সুরমা চোখে নারীরা সবসময় প্রশংসিত হয়ে আসছেন। এমনকি গানও আছে এ নিয়ে। কিন্তু সুরমা চোখে পুরুষরা বলিউডের ছবিতে কেন জানি শুধু নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে। সুরমা দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে, যা একজন পুরুষকে নেতিবাচক বোঝাতেই ব্যবহার হয়ে আসছে। যেমন— অগ্নিপাথে অমিতাভ বচ্চন  ডাকাতের চরিত্রে অভিনয় করেছেন চোখে সুরমা দিয়েই। মাকবুলে পঙ্কজ কাপুর ও ওয়ান্টেডে প্রকাশ রাজ দুজনই সন্ত্রাসীর ভূমিকায় চোখে সুরমা দিয়েই অভিনয় করেছেন। এমনকি রইসেও শাহরুখ চোরাচালানকারী হিসেবে চোখে সুরমা দিয়েছেন। পদ্মাবতী ছবিটিও প্রমাণ করল বলিউডে নেতিবাচক চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে খলনায়ককে ক্রূর দেখাতে সুরমা চোখের বাইরে যেতে পারেননি নির্মাতারা।

পদ্মাবতী : এক রাজা-রানির প্রেম কথা


বিবিএস এন্টারটেইনমেন্ট :  ‘পদ্মাবতী’-এই শব্দটির সঙ্গে কিছুদিন আগেও আমরা খুব কম জনই পরিচিত ছিলাম।  কিন্তু বলিউডের প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক সঞ্জয় লীলা বনশালির দৌলতে আজ আমরা প্রায় প্রত্যেকেই ‘পদ্মাবতী’র সঙ্গে পরিচিত৷ ‘পদ্মাবতী’ একটি ঐতিহাসিক চরিত্র যার উপর ভিত্তি করে সঞ্জয় লীলা বনশালি একটি ছবি তৈরি করেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে 1 ডিসেম্বর ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার কথা ৷ 155 মিনিটের দীর্ঘ এই ছায়াছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন বলিউড থেকে হলিউড কাঁপানো দক্ষ অভিনেত্রী দীপিকা পাডুকোন(রানি পদ্মাবতী), বক্স অফিসে বাজিমাত করা অভিনেতা শাহিদ কাপুর(রতন সিং) ও রণবীর সিং(আলাউদ্দিন খিলজি)৷ ছবির শুটিং চলাকালীন পরিচালক-সহ তাঁর টিম কয়েকবার উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে আক্রান্ত হন। তাদের অভিযোগ ছবিতে পদ্মাবতীর চরিত্রকে বিকৃত করে ও আলাউদ্দিন খিলজিকে কিছুটা নমনীয় হিসাবে দেখানো হয়েছে৷ রানি পদ্মিনী এবং ‘পদ্মাবতী’ সিনেমাটিকে নিয়ে মানুষের মনে কৌতূহলের সীমা নেই। কিন্তু আপাতত পরিবেশ-পরিস্থিত যা, তাতে ছবিটি নির্ধারিত সময়ে মুক্তি পাবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট দোলাচল রয়েছে। তাই এই সিনেমাটির সম্পর্কে কিছুটা আগাম ধারণা নিতে আজ ‘পদ্মাবতী’ কাব্যটি সম্পর্কে আলোচনা করব ৷

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের একটি উজ্জ্বল নিদর্শন আলাওলের অনুবাদ কাব্যগ্রন্থ ‘পদ্মাবতী’৷ তিনি মালিক মহম্মদ জায়সী এর ‘পদুমাবৎ’ কাব্যের অনুবাদ করে রচনা করেন ‘পদ্মাবতী’৷ জায়সী তাঁর এই কাব্যটি রচনা করেন 1540 খ্রিস্টাব্দে এবং এর  প্রায় 100 বছর পর আরাকানের বৌদ্ধ রাজার অমাত্য মাগন ঠাকুরের নির্দেশে আলাওল 1648 খ্রিস্টাব্দে ‘পদ্মাবতী’ রচনা করেন ৷ আলাওল তখন মাগন ঠাকুরের সভাসদ এবং আশ্রিত৷ ‘পদ্মাবতী’ কাব্যের কাহিনীতে ঐতিহাসিক সত্যতা কতটুকু তা নিশ্চিত হওয়া যায় না৷ সম্ভবত কবিচিত্তের কল্পনাই জায়সী এবং আলাওল দুজনকেই প্রভাবিত করেছিল৷ বাংলায় ‘পদ্মাবতী’ রচনায় আলাওল মূলত পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দের আশ্রয় নিয়েছেন৷ মধ্যযুগের ধর্মীয় সাহিত্যের ঘনঘটার মধ্যে এই ‘পদ্মাবতী’ কাব্যগ্রন্থ স্বতন্ত্ররীতির এক অনুপম শিল্পকর্ম৷ ‘পদ্মাবতী’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে আলাওলের কবিপ্রতিভার স্বাক্ষর পাওয়া যায় ।

বিভিন্ন উৎসে অনেক রদ-বদল আছে এই কাহিনির ৷ অনেকটা রুপকথার মতোই এই কাহিনি৷ অনন্য সুন্দরী পদ্মাবতী(যিনি পদ্মিনী নামেও পরিচিত) ছিলেন সিংহলের(শ্রীলঙ্কা) রাজকন্যা ৷ আবার কারও মতে সিংহল নয়, উত্তর ভারতের হরিয়ানার ‘সিঙ্ঘাল’ নামক জায়গাটিই ছিল পদ্মাবতীর বাসস্থান ৷

রাজভবনের কথাবলা শুকপাখি হিরামন পদ্মাবতীর অত্যন্ত প্রিয় ৷ পদ্মাবতী ক্রমে যৌবনবতী হলে তাঁর রূপের সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে৷ রাজকন্যার বিয়ে হচ্ছে না দেখে হিরামন বলল, সে দেশ-দেশান্তরে ঘুরে তার জন্য উপযুক্ত বর খুঁজে আনবে৷ এ সংবাদ শুনে রাজা ক্রুদ্ধ হয়ে শুককে মারার আদেশ দিলেন৷ পদ্মাবতী অনুনয়-বিনয় করে শুকের প্রাণ রক্ষা করলেন৷ এরপর থেকে শুক সুযোগ খুঁজতে লাগল কোনোক্রমে রাজভবন ছেড়ে চলে যেতে৷ একদিন পদ্মাবতী মানসসরোবরে সখীদের সঙ্গে নিয়ে স্নান করতে গেলে শুকপাখি এই সুযোগে বনে উড়ে গেল৷

চিন্তাশীল শুক সেই বনে এক ব্যাধের হাতে ধরা পড়ে গেল৷ ব্যাধ শুককে সিংহলের হাটে নিয়ে বিক্রি করতে এলে চিতোরের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে আসা ব্রাহ্মণ শুকপক্ষীর জ্ঞান এবং পাণ্ডিত্যের কথা শুনে শুককে ক্রয় করে চিতোর দেশে আসেন৷ শুকের প্রশংসা শুনে চিতোরের রাজা রতন সিং লাখ টাকা দিয়ে হিরামনকে ক্রয় করেন ৷ এদিকে রানি নাগমতী শুকের কাছে পদ্মিনীর রূপের বর্ণনা শুনে ভাবলেন, যদি এখানে এ-পাখি থাকে তাহলে একদিন না একদিন রাজা এসব শুনবেন এবং তাঁকে ছেড়ে পদ্মাবতীর জন্য গৃহত্যাগ করবেন৷ তিনি তাই ধাত্রীকে ডেকে শুককে হত্যা করতে আদেশ দিলেন কিন্তু ধাত্রী পরিণামের কথা চিন্তা করে শুককে লুকিয়ে রাখেন৷

রাজা ফিরে এসে শুককে না দেখে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলে শুককে অন্তরাল থেকে তাঁর সামনে নিয়ে আসেন সেই ধাত্রী৷ শুক সমস্ত বৃত্তান্ত রাজাকে শোনান, পদ্মাবতীর রূপের দীর্ঘ বর্ণনা শুনে রাজা পদ্মাবতীকে পাওয়ার উদ্দেশ্য হিরামনকে সঙ্গে নিয়ে সিংহল যাত্রা করেন৷ নানা দুর্গম পথ অতিক্রম করে তাঁরা অবশেষে সিংহল দেশে মহাদেবের মন্দিরে উপস্থিত হন৷ হিরামন পদ্মাবতীর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় রতন সিংকে বলে গেল, বসন্ত পঞ্চমীর দিনে তিনি পদ্মাবতীর দর্শন পাবেন এবং তাঁর আশা পূর্ণ হবে৷

অনেকদিন পর হিরামনকে পেয়ে পদ্মাবতী আনন্দে আকুল হয়ে ওঠেন। হিরামন রতন সিংয়ের রূপ, কুল, শৌর্য ও ঐশ্বর্য বর্ণনা করে এবং বলে, রতন সিং সবদিক থেকে তাঁর যোগ্য পুরুষ৷ পদ্মাবতী রতন সিংয়ের ত্যাগ ও প্রেমের কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিলেন, বসন্ত পঞ্চমীর দিন পুজো উপলক্ষে রতন সিংকে দেখতে যাবেন ও তাঁকে জয়মাল্য দেবেন৷ বসন্ত পঞ্চমীর দিন পদ্মাবতী সখীদের নিয়ে মণ্ডপে ঘুরতে ঘুরতে যেদিকে রতন সিং ছিলেন সেদিকেই এলেন৷ পদ্মাবতীর সঙ্গে রতন সিংয়ের সাক্ষাৎ হল৷ পদ্মাবতী রতন সিংকে দেখে বুঝলেন, শুক যে-কথা বলেছে তার কোথাও ত্রুটি নেই৷ পদ্মাবতী ও রতন সিংয়ের প্রণয়-সংবাদ পেয়ে পদ্মাবতীর বাবা রাজা গন্ধর্ব্যসেন ক্রুদ্ধ হন৷ রতন সিংয়ের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করেন৷ এ সময় মহাদেবের আগমণ এবং তাঁর মধ্যস্থতায় সাড়ম্বরে রতন সিংয়ের সঙ্গে পদ্মাবতীর বিয়ে হয় ৷



এদিকে চিতোর বিরহিণী নাগমতী রাজার কথা ভেবে ভেবে এক বর্ষ কাটান৷ তাঁর ক্রন্দন শুনে পশুপাখি পর্যন্ত বিহ্বল হত৷ একদিন রাত্রিবেলায় একটি পাখি নাগমতীকে তাঁর দুঃখের কারণ জিজ্ঞেস করলে নাগমতী তাঁকে রাজার কাছে পাঠিয়ে দেন৷ পাখির কাছে নাগমতীর দুঃখের কথা এবং চিতোরের হীন দশার কথা শুনে রতন সিংয়ের মনে দেশের কথা উদয় হলো৷ তিনি চিতোরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলেন। যাত্রার প্রাক্কালে সমুদ্র রাজা অমূল্য বহু রত্ন উপহার দিলেন৷ এসব অমূল্য রত্ন নিয়ে রতন সিং ও পদ্মাবতী চিতোরে উপস্থিত হলেন৷ নাগমতী ও পদ্মাবতী দুই রানিকে নিয়ে রাজা সুখে সময় নির্বাহ করতে শুরু করেন।

রতন সিং এর সভায় রাঘব চেতন নামে এক সঙ্গীতকার ছিলেন। তিনি আবার গোপনে জাদুবিদ্যা চর্চা করতেন৷ সেসময় রাজ্যে জাদুবিদ্যা চর্চা নিষিদ্ধ ছিল৷ একদিন জাদুচর্চার সময় হাতে নাতে ধরা পড়লে রাজা তাকে রাজ্য থেকে নির্বাসিত করেন৷ এই অপমানের জ্বালায় প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে ওঠেন রাঘব চেতন৷ তিনি সোজা দিল্লি গিয়ে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির দরবারে আশ্রয় নেন৷

রতন সিং কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে রাঘব চেতন দিল্লিতে গিয়ে একটি জঙ্গলে আশ্রয় নেয়৷ তিনি জানতেন সেই জঙ্গলে আলাউদ্দিন খিলজি নিয়মিত হরিণ শিকারে আসতেন৷ একদিন আলাউদ্দিন দলবল নিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করার পর রাঘব অতি সুমধুর সুরে বাঁশি বাজাতে থাকে। সুরে মুগ্ধ হয়ে আলাউদ্দিন নির্দেশ দেন তাকে ধরে আনার৷ সুলতানের সামনে উপস্থিত হয়ে কৌশলে রাঘব নিজের দুরভিসন্ধি কাজে লাগাতে শুরু করে৷ সে বলে, কেনো সুলতান মামুলি একজন বাঁশিওয়ালাকে নিয়ে পড়ে আছেন যখন পাবার মতো আরও অনেক সুন্দর জিনিস আছে৷ প্রতিশোধপরায়ণ রাঘব রানী পদ্মাবতীর রুপের গুণাগুণ বর্ণনা করতে থাকে সুলতানের কাছে ৷ সেই রূপকথনের জালে জড়িয়ে আলাউদ্দিন খিলজি প্রাসাদে ফিরে তৎক্ষণাৎ চিতোরের দিকে সৈন্য পরিচালনার আদেশ দেন ৷

কিন্তু চিতোর পৌঁছে হতাশ হন খিলজি৷ রতন সিং এর দুর্গটি ছিল অনেক বেশি সুরক্ষিত৷ বাধ্য হয়ে তিনি রতন সিং এর কাছে খবর পাঠান যে তিনি রানি পদ্মাবতীকে শুধু এক ঝলক দেখতে ইচ্ছুক ৷ তাকে দেখতে পেলেই তিনি সসৈন্যে দিল্লি ফিরে যাবেন৷ তিনি এটাও উল্লেখ করেন যে, পদ্মাবতীকে তিনি বোনের মতো দেখেন। অবশ্য খিলজীর অভিপ্রায় সম্পর্কে সকলেই অবগত ছিলেন৷ একজন রাজপুত নারীর জন্য এই প্রস্তাব ছিল অসম্মানজনক৷ তাদের প্রথা অনুযায়ী অচেনা ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করা নারীদের জন্য বারণ ছিল ৷ কিন্তু নিশ্চিত যুদ্ধ এড়াতে রতন সিং পদ্মাবতীকে রাজি করান৷ শর্ত রাখা হয় যে, আলাউদ্দিনকে আয়নায় রানির প্রতিচ্ছবি দেখতে হবে৷ মহলের একটি কক্ষে এমনভাবে কিছু আয়না স্থাপন করা হয় যাতে সরাসরি সাক্ষাৎ না করে দূর থেকেই রানি নিজের প্রতিবিম্ব দেখাতে পারেন৷ কিন্তু এই উপায়ে রানিকে চাক্ষুস দেখার পর আলাউদ্দিনের বদ অভিপ্রায় আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে, যে করেই হোক পদ্মাবতীকে তাঁকে পেতেই হবে ৷


শিবিরে ফেরার সময় কিছুদূর পর্যন্ত পথ রতন সিং আলাউদ্দিনকে এগিয়ে দিতে আসেন৷ ছল করে এই সুযোগে আলাউদ্দিন রতন সিংকে তৎক্ষণাৎ অপহরণ করেন৷ রাজার মুক্তিপণ হিসেবে তিনি দাবি করেন রানি পদ্মাবতীকে৷ গোরা আর বাদল নামে দুই বীর রাজপুত সেনাপতি তখন আলাউদ্দিন খিলজিকে তার নিজের খেলাতেই হারানোর ফন্দি আঁটেন ৷ তাঁরা খবর পাঠালেন, পরদিন সকালে রানি পদ্মাবতী তাঁর দাসী-বাদিসহ পালকিতে খিলজির শিবিরের দিকে রওনা দেবেন৷ পরদিন 150 মতান্তরে 200 পালকি খিলজির শিবিরের দিকে রওনা হয়৷ কিন্তু প্রত্যেকটি পালকি ছদ্মবেশে চারজন করে দুর্ধর্ষ রাজপুত যোদ্ধাদের দ্বারা বাহিত হচ্ছিল আর প্রত্যেক পালকিতে দাসীর বদলে লুকিয়ে ছিল আরও চারজন করে যোদ্ধা৷ এই প্রতিহিংসাপরায়ণ ভয়ানক সৈন্যদলটি খিলজির শিবিরে পৌঁছেই অতর্কিত হামলা করে বসে৷ আলাউদ্দিন খিলজির শিবিরে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালিত করে এই সেনাদল রাজা রতন সিংকে মুক্ত করে নিয়ে যায়।

এই ঘটনায় পরবর্তীতে দ্বিগুণ আক্রোশে আরও বেশি সৈন্য নিয়ে আলাউদ্দিন চিতোরের দুর্গ অবরোধ করেন৷ অতি সুরক্ষিত সেই দুর্গে প্রবেশ করতে না পারায় অবরোধই ছিল একমাত্র পথ৷ দিনের পর দিন অবরুদ্ধ থাকার পর দুর্গের ভেতরের রসদ ফুরিয়ে এলে রাজা রতন সিং সিদ্ধান্ত নেন দুর্গের ফটক খুলে মুখোমুখি হবার৷ দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকার পর রাজপুতদের জন্য এ যুদ্ধ ছিল অসম যুদ্ধ৷ পদ্মাবতী ও দুর্গের অন্যান্য নারীরা জানতেন এ যুদ্ধে তাঁদের পুরুষদের জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ৷ এরকম পরিস্থিতিতে সম্মান রক্ষায় রাজপুত নারীদের মধ্যে ‘জওহর’ নামক আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহননের এক রকম প্রথার প্রচলন ছিল৷ বিজয়ী সৈন্যদের হাতে লাঞ্চিত হবার চেয়ে মৃত্যুকেই তাঁরা বেশি শ্রেয় মনে করলেন ৷  Source : (http://www.padmavati-movie.com)

রাতে দুর্গের ভেতরে এক বিশালাকার অগ্নিকুন্ড জ্বালানো হল৷ সবচেয়ে সুন্দর পোশাকে সজ্জিত হয়ে ধর্মীয় সঙ্গীত গেয়ে আত্মসম্মান রক্ষায় আগুনের আলিঙ্গনে অগ্রসর হলেন নারীরা৷ সবার আগে আগুনে ঝাঁপ দিলেন রানি পদ্মাবতী। অন্যরা তাঁকে অনুসরণ করলেন ৷ স্বজনহারা সৈনিকদের বেঁচে থাকার আর কোনো উপলক্ষ্য থাকল না ৷ পরদিন সকালে যুদ্ধের সাজে সেজে খিলজি বাহিনীর সাথে লড়তে বেরিয়ে গেল রাজপুতদের দল৷ ফলাফল যা হবার তাই হল৷ খিলজির সেনাদল যখন দুর্গে প্রবেশ করল তখন শুধু নারীদের দেহাবশেষ আর ভস্মই পেলো, যার মোহে এতো জনবল ক্ষয় করলেন আলাউদ্দিন খিলজি, তাঁকে আর তাঁর পাওয়া হলো না ৷


চিতোরের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম জওহরের ঘটনা৷ চিতোরের দুর্গে এর পরেও দু-বার জওহরের ঘটনা ঘটে৷ দ্বিতীয়বার 1535 সালে রানি কর্নাবতি গুজরাটের রাজা বাহাদুর শাহের কবল থেকে সম্মান বাঁচাতে সদলে এই পথ বেছে নেন৷ এরপর তৃতীয় জওহরের ঘটনা ঘটে 1567 সালে, মহামতি আকবরের চিতোর দখলকালে৷

ইতিহাস সবসময় অবিকৃতভাবে আমাদের কাছে আসে না৷ যুগের প্রবাহের সাথে এর অনেক কিছুই রদ-বদল হয়। কখনো লোক মুখে, কখনো কলমের খোঁচায়৷ কখনো শুধু নাম বা বংশ পরিচয় ঢেকে দেয় ব্যক্তির কুকীর্তি, আবার কখনো কর্ম হারিয়ে দেয় বংশ পরিচয়কেও ৷

এই কিংবদন্তীর প্রথম লিখিত বর্ণনা পাওয়া যায় 1540 সালে ৷ পরবর্তীতে কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত রুপে এই কাহিনি লিপিবদ্ধ হয় বেশকিছু ঐতিহাসিকের লেখনীতে৷ এঁদের মধ্যে আকবরের বিখ্যাত সভাসদ আবুল ফজল, প্রখ্যাত মধ্যযুগীয় ঐতিহাসিক ফিরিশতা উল্লেখযোগ্য ৷ রাণা প্রতাপের আমলে রাজপুত ইতিহাস গ্রন্থ ‘খুমান খায়সায়’ স্থান পায় এই কাহিনি ৷ তবে স্বাভাবিকভাবেই, বিভিন্ন ঐতিহাসিকের বর্ণনায় এই কাহিনি কিছুটা ভিন্ন ভাবে এসেছে ৷

অনেকের মতে আবার এই কাহিনি রাজপুত ইতিহাসকে গৌরবান্বিত করতে ও আলাউদ্দিনকে কালিমালিপ্ত করতে নিছক একটি রূপকথা ৷ তবে কাহিনিটি কতটা সত্য, আর কতোটা মিথ্যা তা বর্তমানে নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা একেবারেই অসম্ভব ৷

সবশেষে বড় কথা হল যে এতো বছর পরেও বিতর্ক ও ধর্মভিত্তিক মেরুকরণে এতোটুকু ভাটা পড়েনি রানি পদ্মাবতীর চরিত্রে। তবে আত্মসম্মান রক্ষায় বিস্ময়কর আত্মাহুতি দিয়ে মানুষের মনে চিরকালের জন্য জায়গা করে নিয়েছেন রানি পদ্মাবতী ৷



EmoticonEmoticon